কুষ্টিয়া প্রতিনিধি: মো. মুনজুরুল ইসলাম
নিষ্পাপ এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় শোক, ক্ষোভ ও উদ্বেগে উত্তাল হয়ে উঠেছে কুষ্টিয়া। চিকিৎসা নিতে এসে আর ঘরে ফেরা হলো না ছয় বছরের তাসনিয়া আফরিনের। কুষ্টিয়া শহরের মোল্লাতেঘরিয়া এলাকার একতাডায়াগনস্টিক সেন্টারে হাতের অস্ত্রোপচারের সময় অ্যানেসথেসিয়া প্রয়োগের পর তার মৃত্যু ঘিরে উঠেছে ভুল চিকিৎসা ও অবহেলার গুরুতর অভিযোগ। এ ঘটনায় জনমনে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র প্রতিক্রিয়া; স্বজনদের আহাজারি আর ন্যায়বিচারের দাবিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো পরিবেশ।
সোমবার রাত আটটার দিকে ঘটে এই মর্মান্তিক ঘটনা। নিহত তাসনিয়া কুমারখালী উপজেলার সানপুকুরিয়া গ্রামের তরিকুল ইসলামের মেয়ে। পরিবার সূত্রে জানা যায়, কয়েকদিন আগে বাড়ির সিঁড়ি থেকে পড়ে তার বাঁ হাত ভেঙে যায়। অবস্থার অবনতি হলে তাকে একতা প্রাইভেট হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে অস্ত্রোপচারের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে অ্যানেসথেসিয়া প্রয়োগের কিছুক্ষণের মধ্যেই শিশুটি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
স্বজনদের অভিযোগ, চিকিৎসকদের অবহেলা কিংবা ভুল প্রয়োগের কারণেই অকালে ঝরে গেল একটি তাজা প্রাণ। নিহতের খালু আতিয়ার রহমান বলেন, “সঠিক চিকিৎসা পেলে হয়তো আমার ভাগনিকে বাঁচানো যেত। আমরা এই মৃত্যুর বিচার চাই।”
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই হাসপাতালজুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষুব্ধ স্বজন ও স্থানীয়রা বিক্ষোভ ও ভাঙচুরে জড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। পরে অপারেশনে উপস্থিত দুই চিকিৎসককে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়।
অপারেশনে উপস্থিত চিকিৎসকদের একজনের দাবি, শিশুটির প্রাথমিক শারীরিক পরীক্ষা স্বাভাবিক ছিল এবং জেনারেল অ্যানেসথেসিয়া প্রয়োগের পর হঠাৎ কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে মৃত্যু হতে পারে। তবে চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, এ ধরনের ঘটনায় প্রকৃত কারণ নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত ও ময়নাতদন্ত জরুরি।
এদিকে একতা ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে ঘিরে দালালচক্র ও নানা অনিয়মের অভিযোগ বহুদিনের—এমন আলোচনা নতুন করে সামনে এসেছে। সচেতন মহল বলছে, এই মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহিতা, রোগী নিরাপত্তা ও তদারকি নিয়ে আবারও বড় প্রশ্ন উঠেছে।
কুষ্টিয়ার সিভিল সার্জন এস এম কামাল হোসেন জানিয়েছেন, ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। অবহেলা বা গাফিলতির প্রমাণ মিললে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কুষ্টিয়া মডেল থানা পুলিশও জানিয়েছে, দুই চিকিৎসককে হেফাজতে রাখা হয়েছে এবং অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
একটি শিশুর মৃত্যু কখনোই কেবল পরিসংখ্যান নয়—এ এক পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ, সমাজের জন্য বেদনার প্রতিচ্ছবি। তাসনিয়ার মৃত্যু যেন আরেকটি ফাইলবন্দি ঘটনা হয়ে না থাকে—এই প্রত্যাশা এখন কুষ্টিয়াবাসীর। সবার চোখ এখন প্রশাসনের দিকে—এই ঘটনায় সত্য উদঘাটন ও দোষীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয় ‘কর্তাব্যক্তিরা’, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
এ জাতীয় আরো খবর..