কুষ্টিয়া প্রতিনিধি | মো. মুনজুরুল ইসলাম
কুষ্টিয়া শহরে আধুনিক ও স্বাস্থ্যসম্মত মাংস উৎপাদনের নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে। প্রায় ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে লাহিনী বটতলা ক্যানালপাড়ায় নির্মিত আধুনিক জেলা কসাইখানা গত ২ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়েছে। শরিয়তসম্মত পদ্ধতিতে পশু জবাই, পরিচ্ছন্ন পরিবেশে মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিয়ে নির্মিত এ স্থাপনা দীর্ঘদিনের অস্বাস্থ্যকর ও অনিয়ন্ত্রিত পশু জবাইয়ের চিত্র বদলে দেওয়ার প্রত্যাশা তৈরি করেছে।
তবে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ে নির্মিত এই অবকাঠামো কতটা কার্যকরভাবে নগরবাসীর কাজে আসছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, আধুনিক কসাইখানা নির্মাণই শেষ কথা নয়; নিয়মিত তদারকি, মাংস ব্যবসায়ীদের বাধ্যতামূলক ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং স্বাস্থ্যবিধি বাস্তবায়ন না হলে কাঙ্ক্ষিত সুফল অধরাই থেকে যেতে পারে।
যত্রতত্র জবাইয়ে বাড়ে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশঝুঁকি
কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে রাস্তার পাশে, বাজারের আশপাশে এবং আবাসিক এলাকার কাছাকাছি পশু জবাইয়ের চিত্র দেখা গেছে। জবাইয়ের পর রক্ত, বর্জ্য ও পশুর বিভিন্ন অবশিষ্টাংশ খোলা জায়গায় পড়ে থাকায় সৃষ্টি হয় দুর্গন্ধ ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। বর্ষায় এসব বর্জ্য নালা-নর্দমা ও জলাশয়ে মিশে পরিবেশদূষণের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করে।
আধুনিক কসাইখানা চালুর ফলে পশু জবাইয়ের জন্য একটি নির্দিষ্ট, নিয়ন্ত্রিত ও স্বাস্থ্যসম্মত স্থান তৈরি হয়েছে। ফলে সঠিকভাবে ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে শহরের উন্মুক্ত স্থানে পশু জবাই, বর্জ্য ছড়িয়ে পড়া এবং দুর্গন্ধের মতো সমস্যাও অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শরিয়তসম্মত জবাই, নিরাপদ মাংসের প্রত্যাশা
নতুন কসাইখানায় পশু জবাই থেকে শুরু করে মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ পর্যন্ত নির্ধারিত স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের সুযোগ রাখা হয়েছে। এতে ধর্মীয় বিধান মেনে পশু জবাইয়ের পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ পরিবেশে মাংস প্রস্তুতের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ভোক্তাদের জন্য নিরাপদ মাংস সরবরাহের ক্ষেত্রে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে পশু জবাই ও মাংস কাটাকাটির ফলে মাংসে জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। নির্ধারিত কসাইখানায় জবাই কার্যক্রম কেন্দ্রীভূত করা গেলে এ ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হবে।
অবকাঠামো নয়, কার্যকর তদারকিই বড় চ্যালেঞ্জ
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রায় ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই স্থাপনার প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে এর নিয়মিত ও কার্যকর ব্যবহারের ওপর। কসাই ও মাংস ব্যবসায়ীদের নির্ধারিত স্থানে পশু জবাইয়ে উৎসাহিত করার পাশাপাশি প্রয়োজনে কঠোরভাবে নিয়ম মানাতে হবে। একই সঙ্গে কসাইখানার পরিচ্ছন্নতা, পানি নিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও স্বাস্থ্যবিধি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
শুধু উদ্বোধনের পর কিছুদিন কার্যক্রম চালু রেখে পরে তদারকি শিথিল হয়ে গেলে বিপুল অর্থের এই বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত ফল বয়ে আনবে না—এমন আশঙ্কাও রয়েছে। তাই নগরবাসীর প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিয়মিত পরিদর্শন ও নজরদারির মাধ্যমে কসাইখানাটির কার্যক্রম সচল ও মানসম্মত রাখবে।
নগরবাসীর প্রত্যাশা—উদ্বোধনের আনুষ্ঠানিকতা নয়, দৃশ্যমান পরিবর্তন
প্রায় ৯ কোটি টাকার এই আধুনিক কসাইখানা কুষ্টিয়ার মাংস বাজার ব্যবস্থাপনায় নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। এখন প্রয়োজন এর সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা। শহরের যত্রতত্র পশু জবাই বন্ধ, স্বাস্থ্যসম্মত মাংস উৎপাদন, পরিবেশদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রতিষ্ঠানটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারলেই বিনিয়োগের সার্থকতা মিলবে।
নগরবাসীর প্রত্যাশা, আধুনিক কসাইখানাটি যেন কেবল একটি নতুন ভবন হয়ে না থাকে; বরং নিয়মিত তদারকি ও কঠোর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এটি হয়ে উঠুক নিরাপদ মাংস সরবরাহ, পরিচ্ছন্ন নগর ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার কার্যকর কেন্দ্র।
এ জাতীয় আরো খবর..